বিরাজনীতিকরণের ফাঁদে বিএনপি: তারেক রহমান, ড. ইউনুস ও বিকল্প রাজনীতির সংকট
ভূমিকা
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অদ্ভুত, অদৃশ্য
ও জটিল বাস্তবতা কাজ
করছে—সরকারে যারা আছে, তারা
দৃশ্যত রাজনীতির বাইরে! আর যারা সরকারে
নেই, তারাই যেন অপবাদ ও
গণঅসন্তোষের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। এই
অদ্ভুত পালাবদলে একদিকে যেমন সরকারি দলের
অনুপস্থিতি দেখা যায়, অন্যদিকে
বিরোধী দল বিএনপিকে হঠাৎ
করে রাজপথে জনরোষের মুখে পড়তে দেখা
যাচ্ছে—যার মূল টার্গেট
হয়ে উঠেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
তারেক রহমান। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? কে বা
কারা এই ক্যাম্পেইনের নেপথ্যে?
এর পেছনে কি সত্যিই জনরায়
কাজ করছে, নাকি এটি একটি
গভীর পরিকল্পনার অংশ? এসব প্রশ্নের
উত্তর পেতে হলে আমাদের
বোঝতে হবে ‘বিরাজনীতিকরণ’ কীভাবে
বাংলাদেশের রাজনীতিকে দখল করে নিচ্ছে।
১.
তারেক রহমান: রাজনীতির বাইরে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রে
২০০৮
সালে নির্বাসনে যাওয়া তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে দেশের
বাইরে রয়েছেন। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও রাজনীতির
মাঠে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না।
এর ফলে অনেকেই তাকে
“ছায়া-নেতা” বা “ভার্চুয়াল রাজনীতিবিদ”
বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রতিবার
রাজনৈতিক সঙ্কটে তারেক রহমানের নামই ঘুরে ফিরে
আসে, তাকে নিয়েই শ্লোগান,
বিতর্ক এবং নিন্দা।
২০২৫
সালের জুলাই মাসে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই তারেক
রহমানের নামে মিছিল, “তারেক
ডাকাত”, “খুনি তারেক”, “জঙ্গি
তারেক” ইত্যাদি স্লোগান উঠতে দেখা যায়।
অথচ তারেক রহমান দেশে নেই, সরকারে
নেই, এমনকি রাজপথেও নেই। তাহলে তাকে
নিয়ে এই হঠাৎ কৌশল
কেন?
২.
নতুন ‘ইউনুস সরকার’ এবং বিকল্প রাজনীতির ধাঁধা
২০২৪
সালের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যার পেছনে
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কিছু দেশের
প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এই সরকার
প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের
সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও, একে
“ইউনুসপন্থী প্রশাসন” বলা হচ্ছে কারণ
এদের আদর্শিক, কাঠামোগত ও কূটনৈতিক ভিত
ইউএস-বেজড লিবারেল এজেন্ডায়
প্রভাবিত।
এই সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষ
আশা করেছিল দুর্নীতি, নিপীড়ন ও দলের শাসনের
অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল—এরা
রাজনীতি করতে চায় না,
এবং বড় দলগুলোকে নিষ্ক্রিয়
রাখতে চায়। একে বলে
"বিরাজনীতিকরণ"—যেখানে কোনো রাজনৈতিক শক্তি
না থাকলেও প্রশাসন থাকে, আইনি কাঠামো থাকে,
এবং বিরোধী কণ্ঠগুলো নিষ্ক্রিয় হয়।
৩.
বিরাজনীতিকরণ: একটি স্ট্র্যাটেজিক নীলনকশা
"বিরাজনীতিকরণ"
কোনো সাধারণ সামাজিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি
স্ট্র্যাটেজিক ডিজাইন। এই প্রক্রিয়ার মূল
চারটি ধাপ হলো:
১. রাজনৈতিক নেতাদের ভাবমূর্তি ধ্বংস
২. গণআন্দোলনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি
৩. নির্বাচনের বাইরে ক্ষমতার হস্তান্তর নিশ্চিত করা
৪. রাজনৈতিক বিকল্পকে আগেই নিষ্ক্রিয় করে
দেওয়া
তারেক
রহমানকে লক্ষ্য করে যেসব ভিডিও,
নিউজ ক্লিপ, অতীতের অভিযোগ আবার ভাইরাল করা
হচ্ছে, তা এই পরিকল্পনারই
অংশ। জনগণ যেন ভাবতে
বাধ্য হয়—"যদিও বর্তমান শাসক
ভালো না, তবু তারেক
রহমানকে চাই না।"
৪.
মিডফোর্ড হত্যাকাণ্ড এবং জনগণের মনোযোগ বিভ্রান্তির কৌশল
২০২৫
সালের জুলাইয়ে মিডফোর্ড হাসপাতালে একটি ভয়াবহ খুনের
ভিডিও ভাইরাল হয়। মাত্র দুই
দিন পর, পরিকল্পিতভাবে এটি
ছড়ানো হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।
এটি ছিল এমন এক
সময়, যখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা,
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং বিচারহীনতা নিয়ে
মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল।
এই ঘটনার আবেগ কাজে লাগিয়ে
হঠাৎ করে তারেক রহমানের
নামে বিভিন্ন স্লোগান শুরু হয়। অথচ
এই ঘটনার সঙ্গে তারেক রহমানের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ থেকেই বোঝা যায়—সারাদেশে
এজেন্সিভিত্তিক একটি প্রোপাগান্ডা চালানো
হয়েছে, যার মাধ্যমে মূল
সমস্যাগুলো থেকে জনগণের মনোযোগ
সরিয়ে ‘ভবিষ্যতের শত্রু’ নির্মাণ করা হয়েছে।
৫.
‘লন্ডন চুক্তি’: সত্য, গুজব না কৌশল?
অনেক
বিশ্লেষকের মতে, ২০১৮ সালের
পরে বিএনপি ও তারেক রহমান
একটি অঘোষিত সমঝোতায় যান, যাকে ‘লন্ডন
চুক্তি’ বলা হয়। এই
চুক্তির আওতায় তারেক রহমান নীরব থাকবেন, দেশে
ফিরবেন না এবং বিএনপি
নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, আন্তর্জাতিক সহানুভূতির
পথে এগোবে। এর মাধ্যমে ড.
ইউনুস একটি ‘নির্বাচনবিহীন সরকার’ গঠনের সময় পেতেন।
কিন্তু
সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ড. ইউনুস
নিজেই রাজনীতির ব্যর্থ পথে আটকে পড়েন
এবং নিজের অবস্থান সংহত করতে ফের
সেই পুরনো কৌশল—“তারেক ভয়ের রাজনীতি”—ব্যবহার
করতে শুরু করেন।
তাছাড়া ড. ইউনুস
ও তারেক রহমানের মধ্যে লন্ডন বৈঠকের মাধ্যমে কোনো চুক্তি হয়েছিল কি? তা দেশের জনগণ
জানতে পারেনি।
৬.
বিএনপির অন্ধত্ব ও আত্মপ্রবঞ্চনা
বিএনপি
দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে নেই।
তারা হয় নিষ্ক্রিয়, নয়
আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগে। মাঠের রাজনীতিতে না থেকে ভার্চুয়াল
আন্দোলনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারেক
রহমানের দূরত্ব এবং নেতৃত্বের অভাবে
বিএনপি একপ্রকার বিভ্রান্ত ও দিকহীন হয়ে
পড়েছে।
এই সুযোগে “বিকল্পের অভাবে” জনগণ আবার সেই
পুরনো ভয় দিয়ে পরিচালিত
হচ্ছে—যেমন: “তারেক আসবে মানেই দুর্নীতি,
খুন, জঙ্গিবাদ”।
৭.
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা ও গণতন্ত্রের ফাঁদ
যুক্তরাষ্ট্র,
যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এদের একটি বড়
অংশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে ব্যতিক্রমীভাবে “ম্যনেজড ডেমোক্রেসি” হিসেবে দেখতে চায়। তারা চায়
না একক দলীয় কর্তৃত্ব,
আবার চায় না আদর্শিকভাবে
অপ্রত্যাশিত বিরোধী শক্তি। তাই মাঝামাঝি সমাধান
খুঁজে একটি প্রশাসনিক সরকার
তৈরি করা হয়, যার
নেতৃত্বে রাখা হয় তথাকথিত
‘নিরপেক্ষ’, ‘জনপ্রিয়’, ‘আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তি—যেমন ড. ইউনুস।
এই শাসনকাঠামোতে বিরোধী দল দরকার হয়
না; বরং দরকার একটি
দুর্বল, ভীত ও দায়িত্বহীন
বিরোধী দল—যেমন আজকের
বিএনপি।
৮.
ভবিষ্যতের রাজনীতির ছায়াচিত্র
এই মুহূর্তে তারেক রহমান যতই দূরে থাকুন
না কেন, তাকে ঘিরে
তৈরি করা হচ্ছে এক
রাজনৈতিক ‘পুতুল ভিলেন’, যাতে ভবিষ্যতে কোনো
বিকল্প নেতৃত্বের উত্থান ঠেকানো যায়। একইসঙ্গে ড.
ইউনুস প্রশাসন নিজেকে জাস্টিফাই করার জন্য বারবার
অতীতের চিত্র তুলে ধরছে—যার
মূল লক্ষ্য হলো “বিকল্পহীনতার যুক্তি
তৈরি”।
এখন
আর সরাসরি ক্ষমতা নয়, বরং জনগণকে
এভাবে বোঝানো হচ্ছে:
"আমরা
খারাপ হতে পারি, কিন্তু
ওরা খুনী।"
"আমরা
দুর্বল, কিন্তু ওরা ভয়ঙ্কর।"
"আমরা
ব্যর্থ, কিন্তু ওরা ছিলো জঙ্গি।"
এই ন্যারেটিভ যতক্ষণ সফল, ততক্ষণ জনগণের
মধ্যে ভয় থাকবে। আর
ভয়ই হবে বিরাজনীতিকরণের প্রধান
অস্ত্র।
আমাদের কথাঃ
বাংলাদেশে
আজ রাজনীতি চলছে—রাজনীতিকদের ছাড়া,
বিরোধিতা চলছে—বিরোধীদের অনুপস্থিতিতে,
এবং শাসন চলছে—জনগণের
অধিকারকে বাদ দিয়ে। এই
পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানকে নিয়ে হঠাৎ করে
দেশজুড়ে স্লোগান, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এবং চরিত্র হননের
প্রচেষ্টা নিছক কাকতাল নয়;
এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক
প্রক্রিয়ার অংশ।
বিএনপি
যদি এখনো না জাগে,
না বুঝে এই চক্রান্ত—তাহলে ভবিষ্যতে তারা শুধু রাজনীতি
থেকে নয়, ইতিহাস থেকেও
মুছে যাবে। আর জনগণ? তারা
এক বিকল্পহীন বন্দিশালায় বন্দি থাকবে—যেখানে শাসক নেই, রাজনীতি
নেই, শুধু ব্যবস্থাপনা আর
শ্লোগান।
লেখক:
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক
তারিখ: জুলাই ২০২৫

Comments
Post a Comment