পরিবর্তনের প্যাঁচকাটা চক্র ও চে গুয়েভারার সতর্কতা

 

পৃথিবীর সকল সমাজেই সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তনের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যে ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সেই ব্যবস্থায় যদি শাসকের অহমিকা অতিমাত্রায় প্রবল হয় এবং জনকল্যাণের অনুপস্থিতি প্রকট হয়ে পড়ে, তবে নিঃশব্দে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য কিন্তু অপরিবর্তনীয় স্রোত—ব্যবস্থার বিপরীতে, এক ভাঙনের নেশায়।

কিন্তু ভাঙা মানেই গড়া নয়। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা শুধু কাঠামো ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে, কিংবা নতুন কাঠামো গঠনে যদি দায়বদ্ধতা ও দূরদৃষ্টি অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই পরিবর্তন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ইতিহাস বারবার এই বেদনাময় সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রত্যেক পরিবর্তন এক নতুন সূর্যোদয়ের আশ্বাস নিয়ে আসে মানুষের হৃদয়ে। মানুষ ভাবে—এইবার বুঝি তার জীবনের দীর্ঘ অন্ধকারের অবসান হবে, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্ভোগ হ্রাস পাবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়—শাসক বদলায়, শাসনের চরিত্র নয়। নাম বদলায়, অভ্যাস নয়। হুকুমের ভাষা পাল্টায়, হুকুমের আদল থাকে অপরিবর্তিত। মানুষ ফিরে পায় না তার স্বপ্নের ফল, কেবল ত্যাগই থেকে যায় তার ভাগ্যে।

তখন বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান কিংবা রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন—যে নামেই ডাকা হোক না কেন—তা হয়ে ওঠে অর্থহীন। কারণ পরিবর্তনের সফলতা শুধু ক্ষমতার দখলে নয়, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। যদি তা না ঘটে, তবে বলা যায়, ‘আমার জনম গেল বৃথা কাজে’—যেমন বলেছিলেন জীবনানন্দ।

এই চক্র অদ্ভুত। প্রতিটি নতুন শাসক পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করে, এবং পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় তুলে ধরে একটি ছাঁচে বাঁধা গল্প—“তারা ছিল খারাপ, আমরা ভালো”। কিন্তু কিছুকাল পরেই সেই 'ভালো' গোষ্ঠীই হয়ে ওঠে আরেকটি নতুন ‘তারা’। অতীত থেকে যদি আমরা শিক্ষা না নিই, তাহলে পরিবর্তন অনিবার্যভাবে এক নিষ্ফলা পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হয়—যেখানে একই দুর্নীতি, একই নির্যাতন, একই গণবিরোধী আচরণ শুধু রং বদলায়।

এই প্রেক্ষাপটে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন এক বিপ্লবীর নাম—চে গুয়েভারা। কিউবার বিপ্লব যখন সফল, তখন তিনি কেবল বিজয়ের মুকুট গ্রহণ করেননি, বরং শাসনের কেন্দ্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ তাঁর দর্শন ছিল—"বিপ্লবীর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হলো যেখানে শোষণ এখনও টিকে আছে, সেই জনপদেই তার জায়গা।" কিউবার সরকারে সম্মানিত পদে থেকেও তিনি কঙ্গো ও বলিভিয়ায় যান—সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন—এবং শেষ পর্যন্ত আত্মদান করেন শোষিত মানুষের মুক্তির স্বপ্নে।

চে'র এই পর্ব আমাদের সামনে গভীর এক প্রশ্ন তোলে—পরিবর্তনের পর শাসনের আসনে বসা কি আদৌ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আরও জটিল প্রশ্ন হলো—নবশাসক কি সত্যিই জানেন, জনগণ তাঁদের সম্পর্কে কী ভাবছে?

দুঃখজনক সত্য হলো, শাসনের উত্তাপ যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার উষ্ণতায় লক্ষ লক্ষ মৌমাছির মতো ছুটে আসে সুবিধাভোগীরা। তারা তৈরি করে ধোঁয়াশার বলয়, এক বিভ্রমের রাজনীতি—যেখানে শাসক নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করেন। আর এখানেই পরিবর্তনের পথচ্যুতি শুরু হয়।

পরিবর্তন তখন আর জনতার নয়, কেবল ক্ষমতার হয়। আর এইজন্যই বলা যায়—শুধু শাসনক্ষমতা দখলের নাম বিপ্লব নয়। বিপ্লব তখনই সত্যিকারের হয়, যখন সেই বিপ্লব নাগরিক জীবনে বাস্তব ন্যায়বিচার, সম্মান ও সমতা আনয়ন করে।

চে গুয়েভারার সেই চিঠি—১৯৬৫ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর উদ্দেশ্যে লেখা—আজও আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা:

"আমি ক্ষমতায় নিজেকে যুক্ত করতে চাই না। আমি নিজেকে যুক্ত করতে চাই সেই জনপদে, যেখানে বিপ্লব এখনো প্রয়োজন।"

এবং এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পরিবর্তনের পর ক্ষমতা যদি আবার অপরিবর্তনের নামান্তর হয়ে ওঠে, তবে সেই পরিবর্তন শুধুই আরেকটি ব্যর্থতার মুখচ্ছবি।


বিশেষজ্ঞ মত:

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অনেক জাতি, অনেক সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এই এক চিরন্তন প্যাঁচের কারণে—পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু ফল আসেনি
আশা জাগানো নেতৃত্ব গড়ে তুলেছে বিভ্রমের জগৎ—আর সেই বিভ্রমেই হারিয়ে গেছে স্বপ্ন, সংগ্রাম ও স্বজন হারানোর সব ব্যথা।

তাই এখন সময়, চে'র দর্শনের মতো, সেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, নৈতিক বিপ্লবের—যেখানে শাসকের আসন নয়, জনগণের অধিকার হবে কেন্দ্রস্থল। আর তবেই, পরিবর্তনের অর্থ হবে সত্যিকার পরিবর্তন।




Comments