==========গণতন্ত্রের আসল রূপ========

 


(বর্তমানে গণতন্ত্র ইসলামী গণতন্ত্র বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা চলছে। কেও গণতন্ত্রকে বলছেন হারাম আবার কেও বলছেন আমরা পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নই ইসলামী গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। এক্ষেত্রে আমার কাছে যেটি মনে হয়েছে আমরা যারা বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছি তাদের অনেকেই মূলতঃ রাজনৈতিক মতবাদের ইতিহাস, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি এমনকি গণতন্ত্রের আদ্যোপান্ত না জেনেই বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছি। তাই মূলত বিষয়টিকে ষ্পষ্ট করার পূর্বে গণতন্ত্রের মোটামোটি গোড়ার কথা থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত আজকে লেখার বিষয় বস্তু। যারা বিষয়ে আগ্রহী তারা লেখার সাথে থাকতে পারেন।)

ভূমিকা

'গণতন্ত্র' একটি অতি পরিচিত রাজনৈতিক মতবাদ। এর চিন্তাধারা ঐতিহ্য সূপ্রাচীন। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে অদ্যবধি পর্যন্ত গণতন্ত্র বিভিন্ন যুগে বিচিত্রভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। গণতন্ত্রের সুবিধা আর অসুবিধা নিয়ে আছে যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনা।

গণতন্ত্রের শাব্দিক অর্থঃ

গণতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ democracy democracy শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে। জনগণের শাসন অর্থে প্রয়োগ করেন গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস (Herodotus) মূলগত অর্থে democracy আসে demos (জনগণ) এবং Kratein বা Kratia (শাসন বা ক্ষমতা) থেকে। ইংরেজি ভাষায় democracy শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ষোল শতকে। ফরাসি শব্দ democratia থেকে এসেছে ইংরেজি শব্দ democracy, যদিও এর মূল গ্রিক শব্দদ্বয় demos এবং Kratein সেই থেকে গণতন্ত্র বা democracy-এর ব্যবহার।

গণতন্ত্র শব্দটির অর্থ "জনগণের শাসন", কোন রাষ্ট্রের অথবা কোন সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। যদিও গণতন্ত্র শব্দটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় তবে অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

গণতন্ত্রের সংজ্ঞাঃ

সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের একক কোন সংজ্ঞা নেই, আব্রাহাম লিঙ্কনের (Abraham Lincoln) বক্তব্যে তিনি তার দুমিনিটকাল স্থায়ী ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরে প্রদত্ত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় বলেন :That Government of the people, by the People, for the People, shall not perish from the earth.“ জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকার পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না।

এথেন্সের খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ পেরিক্লিস (Pericles) মতেঃ আমাদের শাসনকে গণতন্ত্র বলে চিহ্নিত করি এজন্য যে, শাসন ব্যবস্থার দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে বহুজনের উপর, কতিপয় ব্যক্তির উপর নয় (We are called a democracy because the administration is in the hands of the many and not in the few) অ্যারিস্টটল তাঁর Politeia গ্রন্থের চতুর্থ অংশের ষাট অনুচ্ছেদে বলেন : সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি, যে ব্যবস্থায় প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি তা কুলীনতন্ত্র এবং যেখানে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে তা গণতন্ত্র (We may lay down generally that a system which does not allow every citizen to share is oligarchical and that one which does so is democratic) এসব সংজ্ঞা ছাড়াও বিভিন্ন লেখক গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করেছেন বিভিন্ন রূপে। কেউ বলেছেন গণতন্ত্র সম্মতির সরকার (Government by consent) কেউবা বলেছেন, গণতন্ত্র জনগণের সার্বভৌমত্ব (sovereignty of the people) কারও মতে, গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন (rule by the majority) কেউ আবার গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করেছেন সীমিত সরকাররূপে (Limited government) এসবই

গণতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাঃ

এবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি গণতন্ত্রের আরো কিছু সংজ্ঞার প্রতি। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রকে মূর্খের শাসন বলে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, যে কোনো সমাজে তাদের সংখ্যাই বেশি। আরেক গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, গণতন্ত্র নিম্নস্তরের শাসনব্যবস্থা। এমিল ফাগুয়ে গণতন্ত্রকে বলেছেন, অক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। আধুনিককালের ট্যালির্যান্ড গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করেছেন মন্দ লোকদের সরকাররূপে।

এসব সংজ্ঞায় গণতন্ত্রের মর্মবাণী অনুরণিত হয় বটে, কিন্তু গণতন্ত্রের অবয়ব সুস্পষ্ট হয় না। যে কোন একটির বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হলে অন্তর্নিহিত বিভ্রান্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধরা যাক, গণতন্ত্র জনগণের শাসন। প্রকৃতপক্ষে জনগণ কোথাও শাসন করেনি এবং করে না। জনগণের শাসন করার ক্ষমতাও নেই। পেরিক্লিস জনগণের শাসন সম্পর্কে আবেগজড়িত কণ্ঠে বিবৃতি দিলেও তিনি জানতেন, জনগণ বলতে যা বোঝায় তারা কোনো সময়ে শাসনকাজের সাথে জড়িত ছিলেন না। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর এথেন্সের দিকে তাকালে চলবে। তখন এথেন্সের জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ। জনসমষ্টির প্রায় অর্ধেকই ছিল ক্রীতদাস এবং যুদ্ধবন্দি। ক্রীতদাসদের শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে ছিল না কোনো অধিকার। শাসনকাজ পরিচালনায় কোনো অধিকার ছিল না মহিলাদের। তারা ছিলেন মুক্ত জনসমষ্টির প্রায় অর্ধেক। সমাজে শিশু-কিশোরদের অংশও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে হিসেব করে দেখা গেছে, এথেন্সের প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল হাজার দশেকের মতো। অ্যারিস্টটলের কথায়, তারাই ছিলেন এথেন্সের নাগরিক। নাগরিকদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রকে পেরিক্লিস বলেছেন, জনগণের শাসন।

যদি বলা হয়, গণতন্ত্র সম্মতির শাসন ব্যবস্থা, সম্মতিভিত্তিক সরকার তবু শব্দগুলোকে বিশ্লেষণ করলেও দেখা দেবে অসংখ্য অসঙ্গতি। প্রশ্ন উঠবে কাদের সম্মতি নিয়ে সরকার? কোন বিষয়ে সম্মতি? কতদিনের জন্য সম্মতি? কারা সম্মতি নেবেন? এই বিভ্রান্তির মধ্যে সম্মতির সরকার হিসেবে গণতন্ত্রের রূপরেখা হয়ে ওঠে অত্যন্ত অস্পষ্ট।

আমরা যদি গণতন্ত্রকে বুঝতে চাই তবে যেহেতু গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক মতবাদ তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্যান্য মতবাদগুলো সম্পর্কে কমবেশী ধারণা রাখা প্রয়োজন। উল্লেখিত আলোচনা থেকে এটা ষ্পষ্ট হয়ে উঠে যে খ্রীষ্টের প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে যে গণতন্ত্রের সৃষ্টি তা কালক্রমে বিভিন্ন আকৃতি প্রকৃতি ধারন করে আজ একবিংশ শতাব্দিতে এসে ভিন্ন রূপে আমাদের সামনে উপস্থিত। শুধু কি গণতন্ত্রের অবস্থা ? না এর পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার আরো নানা ধরণের মতবাদ যুগে যুগে প্রতিষ্ঠা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহ্রত হয়েছে। আমরা জানি প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র মতবাদ সাম্যবাদের কথা, এরিষ্টুটলের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চিন্তার পরপরই শুরু হয় জেনো ক্রিসিপাসের রাষ্ট্র চিন্তায় ষ্টয়িকবাদের উত্থান। এর পর শুরু হয় মধ্যযুগের রাষ্ট্র চিন্তায় সম্রাজ্য চার্চের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ পরিক্রমা। এক পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্রাজ্যের শাসক চার্চের পোপের মধ্যকার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পোপ হয়ে উঠেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। যিশুর বিধান মানব হাতে পরিবর্তিত হয়ে যখন তা পোপের ইচ্ছাঅনিচ্ছার রূপ পরিগ্রহ করে রাষ্ট্রের আইনে পরিণত হলো তখন রাষ্ট্রের নাগরিক গণ ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে আবার আলাদা করে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। এরই মধ্যে ইশ্বরের স্বর্গ রাজ্য রোমের পতনে রাষ্ট্রের নাগরিক গণ রাষ্ট্রের ব্যপারে দেবতাদের অবজ্ঞার প্রজ্ঞাপন জারি করলে সেন্ট অগাষ্টিন রাষ্ট্র চিন্তায় নতুন মতবাদ যোগ করে স্বর্গরাজ্য পার্থিব রাজ্যের ধারণা সৃষ্টি করে ধর্ম রাষ্ট্রকে সসম্মানে আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্ট করেন। সেন্ট টমাস এক্যুনাস ধারণাকে আরো শক্তিশালি ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু মার্সিলিও এসে রাষ্ট্র ধর্মের মধ্যকার যুগসূত্র একেবারেই অস্বীকার করেন। ধর্মের প্রতি তার এলার্জিটিক মনোভাবের কারণে সম্ভবত ধর্মের যাবতীয় বিধিবিধান যা রাষ্ট্রের উপর অনেক সময় প্রভাব বিস্তার করত তাকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তিনি অস্বীকার করে বসেন। পুরোপুরি তিনি ধর্মকে রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসার মত প্রকাশ করেন। এমনকি ধর্মীয় অপরাধের পার্থিব কোন বিচার ধর্মগুরুগণ করতে পারবে না বলে মত দেন। এভাবে ধর্ম হয়ে যায় যার যার ব্যক্তিগত বিষয় আর রাষ্ট্র হয়ে উঠে জনগণের নিয়ন্ত্রনকারী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এর পর ঘটতে থাকে প্লেটোর সাম্যবাদের বিবর্তণের রূপ পরিগ্রহ করে সমাজতন্ত্রের আগমন। রাষ্ট্র পরিচালনার রকম নানাবিধ মতবাদ মানুষের কল্যাণের জন্যই প্রতিষ্টিত করার প্রানপন চেষ্টা চলেছে যুগের পর যুগ।

এভাবে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান থেকে অতীতের দিকে যাত্রা শুরু করি তবে খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রপরিচালনায় ইতিহাসের পাতা পরিভ্রমন করা সম্ভব হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। ইতিহাসের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আকার-আকৃতি, স্বরূপ , আইন, শাসন প্রকৃতি, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করার খুব একটা সুযোগ নেই। সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উৎপত্তি রাষ্ট্রের চিন্তায় জন্ম হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা উৎভাবন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ। সময়ের প্রয়োজনে সকল রাজনৈতিক মতবাদ রাষ্ট্র পরিচালকগণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। আবার প্রতিটি মতবাদই বারবার পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। এমনকি প্রতিটি মতবাদ অন্য এক বা একাধিক মতবাদের ধারক বাহকদের দ্বারা যুক্তিভিত্তিক অথবা অযৌক্তিক উপাখ্যানে সমালোচিত হয়েছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতিটি রাজনৈতিক মতবাদ নীতির কথা বলেছে অথচ নৈতিক ভিত্তির উপর দাড়িয়ে নৈতিকতার সংজ্ঞা নিরূপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বলা যায় প্লেটো সাম্যবাদের কথা বলেছেন অথচ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দাসপ্রথার পক্ষে ছিলেন। এবং সাম্যবাদের নাম করে যৌনতাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্টিত পরিবার প্রথাকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছেন। এরিস্টুটল গণতন্ত্রের কথা বলেছেন অথচ দাসদেরকে রাষ্ট্রের অজৈব যন্ত্রের সাথে তুলনা করে সমগ্র মানবতাকে অপমান করেছেন। ষ্টয়িকবাদে জেনো, ক্রিসিপাস যে ধারণা পেশ করেছেন তা স্রষ্টার ক্ষমতাকে স্বীকার করার কারণে অনেকটা মানবিক আচরণে সমৃদ্ধ কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে রকম স্বর্গীয় বিধি-বিধান প্রয়োজন ছিল তা তাদের কাছে দৃশ্যমান না থাকায় মতবাদের নৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকলেও তা রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি দূর এগুতে পারনি। তাছাড়া মধ্য যুগে চার্চঃকে রাষ্ট্রের কাছে টেনে এনে বিকৃত ঐশ্বরিক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রের নাগরিকগণ যে ধাক্কা খেলো তাতে পরবর্তীকালে মার্সিলিওদের মত ধর্মের প্রতি এলার্জিটিক মনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে এজাতীয় মতবাদ ঐশ্বরিক মতবাদ নামে ইতিহাসের পাতায় কর্মহীন হয়ে পড়ে আছে। সকল রাজনৈতিক মতবাদের পাশাপাশি কালমার্কস, লেনিন, মাউসেতুং প্রমূখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মনোনিবেশ করে এবং অতি প্রাকৃতিক আইনকে অস্বীকার করার মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেন। হেগেলের ঐতিহাসিক দর্শন ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদকে কাল মার্কস তার বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দ্বারা রাষ্ট্রের ভীত রচনা করে একেবারে রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তব নমুনা পেশ করে দেখিয়ে দিলেন। এভাবেই চলছে রাষ্ট্র পরিচানায় নতুন নতুন মতবাদের প্রয়োগ।

বিগত আড়াই হাজার বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে সকল রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে দর্শণগত দিক থেকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি।

অতিপ্রাকৃতিক, সুফিষ্ট মতবাদ, ষ্টয়িক মতবাদ, ঐশ্বরিক মতবাদ, মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থাঃ সকল মতবাদে সামান্য ভিন্নতা থাকলেও এদেরকে সমগোত্রীয় বলে ধরে নেয়া যায়। সকল মতবাদে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিক ছিলেন স্রষ্টা, চূরান্ত আইন প্রনয়নের মালিক তিনি। রাষ্ট্রের নাগরিক কেবল স্রষ্টার প্রতিনিধি।

গণতন্ত্রঃ মতবাদে ধর্মকে গৌণ করে দেখানো হয়েছে। এখানে ধর্মকে অস্বীকার করা হয়নি। তবে একটি রাষ্ট্র যেহেতু কেবলই সমাজবদ্ধতার প্রয়োজনে তৈরী হয়েছে তাই মানুষের কল্যাণে মানুষ ভাববে তার জন্য কি কি মঙ্গলজনক আর কি মঙ্গল জনক নয়। মানুষের জন্য কোন প্রকার আইন সুবিধা জনক আর কোন প্রকার আইন সুবিধাজনক নয়। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম কোন বিষয় নয়। জনগণের মতামত প্রধান। রাষ্ট্রের জনগন যেটি চাইবে তাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক শক্তি। মতবাদে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার না করে সকল ধর্মের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে এবং সকলের যার যার ধর্ম পালন করা বা না করার অধিকার আছে বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

মার্কসবাদী বা বস্তবাদী মতবাদঃ মতবাদ হেগেলের দর্শন, ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদের মাধ্যমে পরিপুষ্ট রাজনৈতিক দর্শণ। মতবাদে স্রষ্টার অস্তীত্বকে একেবারেই অস্বীকার করা হয়েছে। সাম্যবাদের স্লোগান তুলে শ্রেণী সংগ্রামের নামে ধর্মকে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায় হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আমরা যদি সময়ের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট নানা রাজনৈতিক রাষ্ট্রনৈতিক মতবাদের চিত্র উপস্থাপন করি তবে একথা ষ্পষ্ট রূপে বলা যায় যে, প্রতিটি মতবাদই তার নিজস্ব সাম্রাজ্যে এক একটি পাত্রের ন্যায় কাজ করেছে মাত্র। প্রতিটি পাত্রই তার সাম্রাজ্যের চিন্তা নায়কদের প্রদত্ত উপাদান ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় তত্ত্ব তথ্যের যোগান দিয়েছে। সময়ের বিবর্তনে যদি পাত্রের কোন উপাদান অপাংক্তেয় বলে মনে হয়েছে , তা পাত্র থেকে সরিয়ে ফেলে নতুন উপাদানের যোগান দেয়া হয়েছে। কোন কোন পাত্র যত্নের অভাবে কালের গর্ভে হারিয়েওগেছে। অতিপ্রাকৃতিক, সুফিষ্ট, ষ্টয়িকবাদ বা ঐশ্বরিক মতবাদের সমগোত্রীয় পাত্রটির অবস্থা তাই হয়েছে। মধ্যযুগের ধর্ম রাষ্ট্রের ভারসাম্যহীন সম্পর্কের কারণে মার্কসবাদীয় বস্তবাদী চিন্তানায়কদের আঘাতে আঘাতে এবং এপাত্রের নির্ভেজাল ঐশ্বরিক উপাদানের দৃশ্যমান উপস্থিতির অপ্রতুলতার কারণে পাত্রটি অর্থহীন হয়ে যায়। অনুরূপ বলা যায়গণতন্ত্ররাষ্ট্র পরিচালনার আর একটি রাজনৈতিক মতবাদের সমৃদ্ধতম পাত্র। খ্রীষ্টের জন্মের ৫০০ বছর পূর্বে পাত্রের গঠন। রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র নামক পাত্রটি যুগে যুগে রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের দেয়া বিভিন্ন উপাদানে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। সময়ের বিবর্তণে দৃশ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ পাত্রটি থেকে অপাংক্তেয় বলে বিবেচ্য উপাদানগুলো সরিয়ে গণতন্ত্রের নতুন উপাদান যোগ করেছেন। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস (Herodotus) ‘গণতন্ত্রকে জনগণের শাসন বলে যে পাত্রের উদ্ভোধন করলেন সে পাত্রে এরিস্টটল গণতন্ত্রের জন্য নতুন কিছু উপাদান রাখলেন। গণতন্ত্রের পাত্রে এরিস্টটলের রাখা উপাদানগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রের নাগরিকের সংজ্ঞায় সংকীর্ণতা দাসপ্রথার মতো অমানবিক উপাদানগুলোকে রেখে দেয়া হয়েছিল গণতন্ত্রের উপাদান বলে। প্রাচীন এথেন্সে পাত্রে যে সকল উপাদানগুলোকে গণতন্ত্রের উপাদান বলে মনে করা হতো তার অনেক উপাদানই পরবর্তীতে অপাংক্তেয় বলে পাত্র থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দাস প্রথাকে গণতন্ত্রের পাত্র থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ দিকে আব্রাহাম লিংকনের মাধ্যমে মানবতার নামে চালিয়ে দেয়া অমানবিক দাসত্ব প্রথার বিলোপ সাধনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পাত্রটিকে পূনরায় ওয়াশ করা হয় এবং পাত্রটির নাম প্রাচীন গণতন্ত্রের পরিবর্তে আধুনিক গণতন্ত্র বলে পরিবর্তন করা হয়। ভাবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গণতন্ত্রের উপাদানে ভিন্নতা এসেছে এবং গণতন্ত্রের পাত্রটির নামও ভিন্ন ভিন্ন করে ডাকা হয়েছে। তাই পৃথিবীতে বহুমাত্রিক পারিপার্শ্বিকতায় গণতন্ত্রের রূপও বহুমাত্রিক। যেমনঃ- Anticipatory, Athenian, Consensus, Deliberative, Demarchy, Direct, Economic, Grassroots, Illiberal, Inclusive, Liberal, Messianic, Non-partisan, Participatory, Radical, Representative, Representative direct, Republican, Social, Sociocracy, Soviet, Totalitarian....

নানা প্রকৃতির গণতন্ত্র থাকলেও একবিংশ শতাব্দির গণতন্ত্রকামী মানব সভ্যতা গণতন্ত্রকে যেভাবে গ্রহণ করতে চায় তা থিউডোর পার্কারের গণতন্ত্রের উপর প্রদত্ত মন্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি বলেন-“ চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে, কথাবলার স্বাধীনতা থাকবে, কাজের স্বাধীনতা থাকবে এবং উপাসনার স্বাধীনতা থাকবে- এই হলো গণতন্ত্রের মতাদর্শএডওয়ার্ডঃ বেলামী বলেন- “ ব্যক্তির মূল্য মর্যাদা দানই হলো গণত্রন্ত্রের প্রথম কথা। মানব প্রকৃতির সাম্যের বিভক্তিতে গঠিত এই মর্যাদা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভাবে সকল ব্যক্তির মধ্যে সমানভাবে বর্তমান। সুতরাং সাম্যই গনতন্ত্রের মূখ্য আদর্শ।

গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যঃ

1. প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন।

2. সরকার পরিবর্তনে নিয়মতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা।

3. একাধিক রাজনৈতিক দলগঠন, মতপ্রাকাশ সমালোচনার অধিকারের স্বীকৃতি

4. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা।

5. সকল নাগরিকের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা।

6. জনগণ যাতে জুলুমের স্বীকার না হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করা।

গণতন্ত্রে অনুধাবনযোগ্য ৪টি সত্যঃ

1. মতামতের দ্বন্দের মধ্যেই নিহিত সত্য গ্রহনযোগ্য।

2. রাষ্ট্রকে কোন অভ্রান্ত সত্যের প্রতীক বলে গ্রহণ করা হয় না।

3. রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আইনের চোখে সবাই সমান।

4. শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সকলের মতামতের দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করতে পারা সঠিক পদ্ধতি।

গণতন্ত্রের মূলনীতিঃ

গণতন্ত্রের মূলনীতি হলো পাঁচটিঃ

1. নির্বাচনের মাধ্যমে অধিকাংশ নাগরিকের সমর্থন যারা পায় তাদের সরকারী ক্ষমতা হাতে নেবার অধিকার রয়েছে।

2. নির্বাচন যাতে নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হতে পারে এর বাস্তব ব্যবস্থা হওয়া অপরিহার্য। নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারই আত্নবিশ্বাস নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারে। বিরোধী দলও এমন সরকারের বৈধতা নৈতিক অবস্থানের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

3. সরকারের ভূলত্রুটি ধরিয়ে দেয়া এবং দেশ জাতির কল্যাণে সরকারের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দান করার জন্য জনগণের অবাধ স্বাধীনতা থাকতে হবে। দেশের আইন-শৃঙ্খলার সীমার মধ্যে থেকে নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকা গণতন্ত্রের প্রধান লক্ষণ।

4. জনগণের মতামত ছাড়া অন্য কোন উপায়ে ক্ষমতা দখল করা গণতান্ত্রিক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

5. সরকার গঠন , পরিবর্তন পরিচালনার ব্যাপারে মৌলিক নীতিমালা শাসনতন্ত্রে বিধিবদ্ধ হতে হবে। শাসনতন্ত্রের বিরোধী কোন নিয়মে সরকার গঠন, পরিবর্তন পরিচালিত হলে তা অবৈধ বিবেচিত হবে।

গণতন্ত্র মূলত কী?

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, প্রাচীন কাল থেকে আজঅবদি এর প্রয়োগ, বৈশিষ্ট্য, এর অনুধাবনযোগ্য সত্য এবং এর মূলনীতি গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় গ্রীসের নগর রাষ্ট্র থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কেবলমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক মতবাদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মতবাদের প্রয়োগের ফলে যে সমস্ত কাজ গুলো সম্পন্ন হয়ে থাকেঃ-

1. রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণের পছন্দ মতো সরকার পরিবর্তন হয়ে থাকে।

2. একটি রাষ্ট্রের সকল মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পায়।

3. রাষ্ট্রের সকল নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়।

4. মত প্রকাশের স্বাধীনতা লাভ করে।

5. ধর্ম বিশ্বাসের অনুমতি পায়।

6. একটি বিধিবদ্ধ শাসনতন্ত্রে মৌলিক নীতিমালা পায়।

7. এক বা একাধিক রাজনৈতিক দল থাকার সুযোগ করে দেয়।

গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তাবলীঃ

নিম্নে গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তাবলী আলোচনা করা হলোঃ

1. গণতান্ত্রিক জনগণঃ গণতন্ত্রকে সাফল্যমন্ডিত করতে হলে সার্বাগ্রে যে জিনিসটির প্রয়োজন তাহল জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক ধারণার উপস্থিতি। Ivor Brown গণতান্ত্রিক ধারণাকে ‘An action of will’ বলে উল্লেখ করেছেন।গণতান্ত্রিক চেতনাই জনগণকে শাসনকার্যে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে। আবার গণতান্ত্রিক শাসসব্যবস্থা তার সাফল্যের জন্য নাগরিকদের কাছে বিশেষ যোগ্যতাও দাবি করে। এর পরিবর্তে নাগরিকরাও সমৃদ্ধ জীবনের সন্ধান পায়। লর্ড ব্রাইস মন্তব্য করেছেন, “ No government demands so much from citizens as democracy and nonages so much back.”

2. একাধিক রাজনৈতিক দলঃ গণতন্ত্রের সাফল্যে একাধিক রাজনৈতিক দল এবং বিরোধীদলের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণঃ একাধিক রাজনৈতিক দল ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে না। এছাড়া একটি শক্তিশালী বিরোধীদল থাকলে সরকার সবসময় সতর্কাবস্থায় থাকে এবং জনস্বার্থে আত্ননিয়োগ করতে বাধ্য হয়।

3. গণতান্ত্রিক পরিবেশঃ মানুষের ব্যক্তিসত্তা পরিপূর্ণাকারে বিকাশের উপযোগী পরিবেশই হল গণতান্ত্রিক পরিবেশ। এর জন্য প্রয়োজন সকল সামাজিক , রাজনৈতিক অথনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি সংরক্ষণ। সামাজিক অথনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং অন্যায় শোষণ গণতন্ত্রের সামাধি রচনা করে।। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক তথা গণতান্তিক পরিবেশ ছাড়া গণতন্ত্রের সাফল্য সুনিশ্চিত হতে পারে না।

4. আইনের শাসনঃ গণতন্ত্রের সফলতার একটি অন্যতম শত হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা আইনের চোখে সবাইকে সমানভাবে দেখতে হবে এতে সকলে সমান অধিকার ভোগ করতে পারবে এবং গণতন্ত্র সফল হবে।

5. যোগ্য নেতৃত্বঃ রাজনৈতিক নেতৃবর্গের ন্যায়নীতি বেবেকবোধের উপর গণতন্ত্রের সাফল্য বহুলাংশে নিভরশীল। স্বাথপর স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব গণতন্ত্রের কবর রচনা করে। এছাড়া দুবল নেতৃত্বের কারণে বহ দেশেই গণতন্ত্র আজ বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। কারণে রাষ্ট্রীয় নেতাদের ন্যায়পরায়ণতা, সততা, উদারচিত্ত, বিবেকবান প্রভৃতি গুণাবলি গণতন্ত্রের সাফল্যে পূবশত হিসেবে গণ্য হয়।

6. উপযুক্ত শিক্ষাঃ শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারকে গণতন্ত্রের সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। গণতন্ত্র হল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শাসন। আর জনগণের অধিকাংশ যদি অশিক্ষিত হয় তবে তাদের পক্ষে যোগ্য বিজ্ঞ প্রতিনিধি নির্বাচিত করা সম্ভব না। ফলে অজ্ঞ অযোগ্য ব্যক্তির হাতে পড়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যথতায় পযবসিত হয়। সেজন্য বলা হয়, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থায় সাফল্যের জন্য জনগণের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার প্রয়োজন।

7. জনমতঃ গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য আর একটি অপরিহার্য্ শত হল সুস্থ, সবল সদাজাগ্রত জনমত। সদা সতক এবং সক্রিয় জনমত সরকারের স্বৈরাচারিতা রোধ করে এবং সরকারকে গণমুখী করে। তাই গণতন্ত্রের সাফল জনমতের উপর বহুলাংশে নিভরশীল।

8. সহিষ্ণুতাঃ পরমত সহিষ্ণুতা গনতন্ত্রের প্রাণ। গনতন্ত্র সংখ্যারিষ্ঠের শাসন। শাসনব্যবস্থাকে সফল করতে হলে সংখ্যালঘিষ্ঠরা যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন মেনে নেবে, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠকেও সংখ্যালঘু তথা বিরোধীদলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সহিষ্ণু মনোভাব পোষণ করতে হবে। এজন্য বলা হয়ে থাকে , Majority must be granted, Mirority should be respected.”

9. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণঃ গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে অন্যতম শত হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক প্রশাসনিকক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। অধ্যাপক ব্রাইস যথার্তই বলেছেন, “ Democracy needs local-self government as its foundation.” স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। আর জনসাধারণ স্থানীয় শাসনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে ব্যাপক সুযোগ পায়।

10. সামাজিক ঐক্যঃ গণতন্ত্রের সফলতার জন্য সামাজিক তথাজাতীয় সংহতি ঐক্য আশ্যক। J.S. Mill এর মতানুসারে, জাতীয় ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন গণতন্ত্র বিকাশের পক্ষে সহায়ক। তাই জনগণের মধ্যে জাতীয় সামাজিক ঐক্যবোধ ছাড়া গণতন্ত্র সফল হতে পারে না।

11. জাতীয় ঐক্য সংহতিঃ গণতন্ত্রের জন্য জাতীয় সংহতি ঐক্য আশ্যক। মিলের মতানুসারে সংহতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন গণতন্ত্র বিকাশের পক্ষে সহায়ক। জনগণের মধ্যে জাতীয় সামাজিক ঐক্যবোধ ছাড়া গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। সামাজিক ঐক্যবোধ সৃষ্টির স্বার্থে জাতিভেদ প্রথা অন্যান্য সামাজিক বৈষম্য দূর করা উচিত।

উপসংহারঃ উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, গণতন্তকে বাস্তবে কার্যকর করে তুলতে হলে বহুবিধ শর্তাবলী পালন করতে হয়। তবে সকল শর্তের মধ্যে সবচেয়ে বড় শত জনগণ। J.S. Mill অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেছেন যে, জনগণকে গণতন্ত্র গ্রহণ করতে, এর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকার করতে এবং তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই কেবল একটি দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সাফল্য অর্জান করতে পারে।

 

Comments

Popular posts from this blog

বিরাজনীতিকরণের ফাঁদে বিএনপি: তারেক রহমান, ড. ইউনুস ও বিকল্প রাজনীতির সংকট

ফরাসি বিপ্লব ব্যবচ্ছেদ

হাসিনা সরকারের পতনের পরে সেনাবাহিনী প্রধান জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এর আগে তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করে হাসিনা সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তার সামগ্রিক ভুমিকা সুনিপুনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করুন।