দৈচুরার কলাম
সাদা সাদা কালা কালা
মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ব্যতীত সাড়ে সাত কোটি বাংগালীর সবাই ভারতের আশ্রয়ে ছিলেন। সেই
সংখ্যায় আমাদের বাপ দাদা সবাই পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরাসরি সাহায্য না করলে বাংলাদেশ হয়ত আজো স্বাধীন হতে পারত না। আর স্বাধীন না হলে আমরা কেউ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা,
সচিব আমলা কিছুই হতে পারতাম না। এই সাড়ে সাতকোটি মানুষক্র একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
যারা একতাবদ্ধ হয়নি তারা রাজাকার, আলবদর, আল শামস নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চরম বিরোধিতা করেছিল। তাদের কার্যক্রম ইতিহাসে লেখা রয়েছে। তাদের বর্বরতার ইতিহাস আমার মরহুম বাবা মায়ের মুখে শুনে নিশ্চিত হয়েছিলাম। আবার মুক্তি যোদ্ধাদের দুর্দশা, ত্যাগ ও বীরত্বগাঁথাও শুনেছিলাম যা আমার বাবা মা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। (বলে রাখি, আমার বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং কর্মসূত্রে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি এই দাবী কখনো করেননি এবং আমাদেরকেও করতে বারণ করেছিলেন। এতটুকু বলি, আমার বাবা আমার মায়ের জেদ বা ভয়ের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন যদিও তার অফিসের অন্য কোন্য কলিগ বেঁচে ছিলেন না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সবার শেষে স্বাধীন হয়েছিল, সম্ভবত ১৯ ডিসেম্বর।)
এসব কথা এজন্য বলছি, এই দেশের মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই দুইভাগে বিভক্ত ছিল। একভাগে বিশাল মেজোরটি, অন্যভাগে মাইনোরিটি মানে স্বাধীনতা বিরোধির চক্র। শেখ মুজিবের ভুল ছিল এদের ক্ষমা করা। তবে ৭৫ সালে তাঁকে রাজনৈতিক কারণে হত্যা করা হয়নি।
সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্তকৃত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে। এদের মধ্যে মেজর ডালিম ছিলেন একজন। শেখ মুজিব হত্যার প্রথম মিটিং খন্দকার মুশতাকের সাথে হয়নি। প্রথম মিটিং হয়েছিল বরখাস্তকৃত মন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের সাথে। রেফারেন্স, "আমি মেজর ডালিম বলছি"। তবে শেখ মুজিব হত্যার বিষয়টি তৎকালীন সেনাবাহিনীর পদস্থ বেশ কিছু কর্মকর্তা জানতেন। তাদের কেউ মুজিব সাহেবকে সতর্ক করেননি। তাদের একজনের নাম নিলে আমার গাড়ে গর্দান নাও থাকতে পারে। জানার জন্য "আমি মেজর ডালিম বলছি" বইটি পড়ে নেবেন। এই বইয়ে প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছে আর বাকি সব অকপট সত্য। এই বাহিনীর বিশ্বাসঘতকতার ইতিহাস নতুন নয়। মেজর ডালিমও এই ভারতের আশ্রয়ে ছিলেন।
এখন 'জয় বাংলা' বললে মানুষকে মেরে ফেলা হয়, পিছিয়ে অথবা কুপিয়ে হত্যা করা হয় অথচ বাস্তবতা হলো বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও এই জয় বাংলা বলে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তখনকার সময়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাত কোটি হয়তো জয় বাংলা বলেছিল বাকি পঞ্চাশ হাজার হয়তো পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছিল।
তাহলে আমাদের বাপ দাদা চৌদ্দগুষ্টি অতীতে ভুল করেছিলেন আর আমাদের নতুন প্রজন্ম সেই ভুলকে শুধরে নতুনভাবে দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে যাচ্ছে। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। কেননা পরিযায়ী পাখিরা তীব্র শীত এলেই স্থানান্তরিত হয়। আমার বেলায় ব্যতিক্রম হবে কেন?
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ইত্যাদি ভুল হলে আমাদের বাপ দাদারা ভুল ছিলেন এটা তারা ঘোষনা দেয় না কেন? একটিমাত্র দলের গীবত করতে করতে জুলাই ঘোষনাপত্র পাঠ করা হল, সেই সাথে এই বিষয়টা জুড়ে দিলে অসুবিধার কিছুই ছিল না। তাতে বরং ভুল শুধরে নতুন সংবিধান রচনার পথ প্রশস্ত হত। আমরাও চাই সবকিছু বদলে যাক। বাংলাদেশ আবারো পূর্ব পাকিস্তান হলেও আমার আপত্তি নেই। কেননা আমার দেহে বা কন্ঠে বল নেই।
যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, মেনে চলে তারা নাকি ভারতীয় অথচ ভারত এই দেশের মানুষকে যে কিভাবে দেখে তা তাদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ দেখলেই বুঝা যায়। ইমার্জেন্সী ছাড়া সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে, স্থল বন্দর বন্ধ করে দিয়েছে, সীমান্তে তীব্র কঠোরতা আরোপ করেছে, অনেক পণ্য রপ্তানি করা বন্ধ করে দিয়েছে, বাংলাভাষীদের জোর করে বের করে দিচ্ছে। আসলে ভারত স্থান দিলে বা নমনীয় হলে তোমাদের এই নব্যসাধীন দেশের ১৮ কোটি জনতার সাড়ে ১৭ কোটি হয়তো ভারতে আশ্রয় নিতো। আর এ কারণেই ভারত সীমান্তে এত কড়াকড়ি আরোপ করেছে, পর্যটক ভিসা বাংলাদেশিদের জন্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে। তারপরও আমি তোমাদের সাথে একমত। আমাদের সময় শেষ, এখন তোমাদের পালা, তোমরা তোমাদের দেশ যেভাবে চালাতে চাও চালাও। তবে আমি আমার মত যারা বেঁচে আছে তারা কখনো মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের স্বাধীনতাকে কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না, অশ্রদ্ধা করতে পারবে না বরং এগুলোর মধ্যেই তারা তাদের হৃত গৌরব খুঁজে বেড়াবে।
আরেকটা মজার বিষয় হল বাংলাদেশ নামক ৯০ স্বাধীন এই দেশের জন্য ৭১ সালে গণহত্যা পরিচালনাকারী দেশ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তীব্র আবেগ লয়ে এদেশে হাজির হয়েছে। তারা যেভাবে পারে যেন বাংলাদেশকে সাহায্য করতে পারলে বাঁচে অথচ গণহত্যার জন্য তারা আজ পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তানের সরকার প্রধান প্রকাশ্যে বললেই তো দিয়েছেন তিনি নাকি ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছেন। এটা তোমাদের জন্য ভালো হতে পারে আমার মত মানুষের জন্য নয়।
তোমরা হয়তো জানো না এদেশের কত ভাগ মানুষ বর্তমানে আওয়ামী লীগ সমর্থন করে। ২০১৮ কিংবা ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অত্যন্ত না যুগ ছিল। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মী এমন কি অনেক বড় নেতাও দলের বিপক্ষে ছিল এ কারণে যে দল হিসাবে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পূর্ণরূপে জনাব বিচ্ছিন্ন হয়ে পুলিশ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তোমরা হয়তো দেখে থাকবে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতাকে সাবেক ছাত্র নেতারা আগস্টের ৪ তারিখ জুতাপেটা করেছিল। শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশ দিলেও দলের নেতাকর্মীরা ৪ আগস্ট এর আগে মাঠে নামেনি যদিও হাসিনা সরকারের পতন ৩ তারিখেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। তোমরা আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছ, দলটির নিবন্ধন বাতিল করেছ, আমার এক বিন্দু আপত্তি নেই। যা অর্জন তা তো পেতেই হবে।
মানুষ অতীতও ভুলে যায়, বর্তমানও ভুলে যায় আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভুল করে। আমরা মানুষ তো ভাই আমাদের যে ভুল হবে না এটা ভাবা মূলক নয়।
তোমরা নিজেদের জেন-জি বলে দাবি করো, তোমরা অনেক জ্ঞানী অন্তত আমাদের চেয়ে অনেক অনেক জ্ঞানী। আমার দুঃখের বিষয় এটাই আজ পর্যন্ত আমি তোমাদের আদর্শ খুঁজে পেলাম না। পৃথিবীতে প্রচলিত অপ্রচলিত হেনো কোন অপকর্ম নেই যা তোমাদের দ্বারা সংঘটিত হয়নি বা হচ্ছে না। আমি তোমাদের মানবতার আদর্শটা জানতে চাই।
আমার ছোট্ট জ্ঞানে আমি এটুকু জানি মানুষ ভুল করলে তাকে শোধরাবার সুযোগ দিতে হয়। তোমরা আওয়ামী লীগকে কোনভাবেই আর শোধরাবার সুযোগ দিতে চাও না। অথচ তোমরা এও জানোনা ১৮ কোটি জনতার মোট কত লোক এই দলের কর্মী সমর্থক। তোমরা জোর করে তাদের কিভাবে শাসন করবে? মুখে হয়তো তোমাদের ভয়ে তোমাদের প্রযুক্ত বলের ভয়ে সাময়িকভাবে তোমাদের শাসন মেনে নেবে কিন্তু তোমরা কোনভাবেই তাদের ভালোবাসা অর্জন করতে পারবেনা এটা সুনিশ্চিত। আর ভালোবাসাহীন জগত কতক্ষণ স্থায়ী হয়?
আমাকে আওয়ামী লীগ বা ভারতীয় ভাবার ঘুম অবকাশ নেই। সম্ভবত আমি কোন জাতীয় নির্বাচনে কখনো ভোট দিতে পারিনি। আগামীতেও দিতে পারব বলে মনে হয় না।
একটা রাষ্ট্র কখন সফল হয় তোমরা জানো? সবার আগে জনগণের মধ্যে অক্ষর এবং ভালোবাসা থাকতে হয়। খবর আছে দেশ প্রেমের কথা।
একটা রাষ্ট্র সফল হওয়ার সবচেয়ে সঠিক নির্দেশক হলো তার নাগরিকদের সার্বিক জীবনমানের উন্নতি। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সমতা—এই সব কিছুর সুষম সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে সফল করে তোলে। রাষ্ট্র যদি এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে যেখানে প্রতিটি মানুষ তার যোগ্যতা ও শ্রমের ন্যায্য প্রতিদান পায়, মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে, এবং ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হওয়া যায়—তাহলেই সেই রাষ্ট্রকে সফল বলা যায়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সাফল্যের মাপকাঠি কেবল GDP বা বিদেশি বিনিয়োগ নয়, বরং নাগরিকের মুখের হাসি, মনে নিরাপত্তা, এবং জীবনের প্রতি আস্থা।
তোমাদের দ্বারা এসবের কোনটি ভাগ কয়টি সাধিত হয়েছে বলে মনে কর? মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলেন তোমরা তাকে হয়ে মেরে ফেলো নতুবা পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে জেলে ভরে রাখো। তোমাদের এই এক বছরে দেশে একটি ন্যায় বিচারের নজির তোমরা দেখাও। মানুষের নিরাপদ কাজ কোথায় তোমরাই বল। কত মানুষ নিজেদের কর্মসংস্থান হারিয়েছে তার পরিসংখ্যান তোমরা হয়তো জানো না। কত কল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে তার হিসাব বলতে পারো? তোমরা বুকে হাত দিয়ে বলো তোমাদের নব্য স্বাধীন বাংলাদেশ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে? অর্থনীতির অবস্থা সেটা তো আমার চেয়ে তোমরাই বেশি ভালো জানো। অন্যান্য অনুসর্গ উপসর্গ না হয় বাদই দিলাম।
আওয়ামী লীগকে শুধরাবার সুযোগ দেবে না এটা ভালো কথা। আমি তোমাদের চিন্তাধারাকে সমর্থন করি। তবে একটা কথা কি জানো, হাসিনা যে ভুল করেছে তোমরাও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছ। আন্তর্জাতিকতা বলে একটা শব্দ আছে জানো তো। তোমরা নির্বাচন করবে এটা নির্বাচন হিসেবে এবং মেনে নেবে বলে আমার মনে হয় না। এটাকে আন্তর্জাতিকতা বলবে প্রহসন। প্রহসনের বা দোষ কি? তোমরা এত নাটক করতে ভালোবাসো? না হয় নাটকই করে যাও। আমরা দূর থেকে তোমাদের নাটক দেখি।
একটা কথা বলি, নিজেদের আগুনে নিজেরা পুড়ে মরো না। এখনো সময় আছে। সুস্থ ও সঠিক চিন্তা কর। অসুস্থ রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে সুস্থ করার দায়িত্ব তোমাদেরই। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাকে বুকে ধারণ কর, দেখবে দেশের মানুষ তোমাদেরকে দ্রুত ভালবাসতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের কল্যাণ ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

Comments
Post a Comment