বাংলাদেশের মতো দেশে মাইক্রো ক্রেডিটের কুফল ও অসুবিধা

 

ভূমিকা

বাংলাদেশকে প্রায়শই ক্ষুদ্রঋণের জনক দেশ বলা হয়ে থাকে। আশির দশকের শেষদিকে এবং নব্বইয়ের দশকে মাইক্রো ক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে ক্ষুদ্রঋণের পরীক্ষাগার বলা হতো, আর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণে এটি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্রঋণের ধারণা ছিল এমনদারিদ্র্যপীড়িত মানুষের হাতে অল্প কিছু মূলধন তুলে দিলে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উৎপাদনমুখী কাজে তা ব্যবহার করে আয় বাড়াতে পারবে এবং দারিদ্র্যের শেকল ভাঙতে সক্ষম হবে। প্রথমদিকে এটি অনেক মানুষের মাঝে আশার আলো জ্বালালেও দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মাইক্রো ক্রেডিট প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি। বরং বহু ক্ষেত্রেই এটি নতুন ধরনের কুফল তৈরি করেছে, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


 

উচ্চ সুদের বোঝা ঋণজাল

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ সাধারণত দরিদ্র মানুষের কাছে অল্প অঙ্কের টাকা সরবরাহ করে, তবে এর সাথে যুক্ত সুদের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। নামমাত্রে এটি ২০৩০ শতাংশ বলা হলেও কার্যত সাপ্তাহিক কিস্তির হিসাব করলে সুদের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যপীড়িত একজন মানুষ সাধারণত আয়ের স্থায়ী উৎস পায় না, ফলে ধারাবাহিক কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে বারবার নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এতে সে ক্রমে এক ধরনের ঋণজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ঋণগ্রহীতা একটি সংস্থার ঋণ শোধ করতে অন্য সংস্থা থেকে ঋণ নেয়, আরেকটি ঋণ শোধ করতে স্থানীয় মহাজনের কাছে ঋণ নেয়ফলে একটি চক্রাকার ফাঁদ তৈরি হয় যা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

টেকসই উন্নয়নের অভাব

ক্ষুদ্রঋণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা টাকার বড় অংশ ভোগ্য খাতে ব্যয় করে থাকে। যেমনবাড়ি মেরামত, চিকিৎসা, সন্তানদের বিয়ে, উৎসব বা দৈনন্দিন ভোগের কাজে। এর ফলে ঋণ থেকে কোনো স্থায়ী আয়-উৎপাদন তৈরি হয় না। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ একধরনের নগদ প্রবাহ সৃষ্টি করলেও এটি শিল্প, কৃষি কিংবা টেকসই কর্মসংস্থান বাড়াতে সক্ষম হয়নি। ফলে দরিদ্র মানুষ সাময়িক স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটে না।

 

মানসিক চাপ সামাজিক অপমান

ঋণ শোধ করার নিয়ম বেশ কঠোর। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি নির্দিষ্ট সময়ে শোধ করতে না পারলে এনজিও কর্মীদের চাপ সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক গ্রামে দেখা যায়, কিস্তি সংগ্রহকারী কর্মীরা ঋণগ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে বারবার উপস্থিত হয়, অন্যদের সামনে অপমানজনকভাবে টাকা চায়, এমনকি কখনও কখনও হুমকি-ধমকি দেয়। এর ফলে দরিদ্র মানুষ মানসিক চাপে ভোগে। পরিবারে কলহ বাড়ে, স্বামীস্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ঋণের ভার বইতে না পেরে কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

সামাজিক বিভেদ দ্বন্দ্ব

ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ সমাজে নতুন ধরনের বিভেদ তৈরি করেছে। যারা ঋণগ্রহণ করে এবং নিয়মিত কিস্তি দিতে সক্ষম হয়, তারা একধরনের সামাজিক অবস্থান পায়। আর যারা কিস্তি শোধ করতে পারে না, তারা অপমানিত বঞ্চিত হয়। এর ফলে গ্রামের ভেতর সামাজিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস হিংসা-বিদ্বেষ বাড়ে। একদিকে ঋণ শোধ করতে না পারা পরিবারগুলো সমাজে অসহায় অবস্থায় পড়ে যায়, অন্যদিকে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি শীতল মনোভাব পোষণ করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি গ্রামীণ সমাজে সহযোগিতা পারস্পরিক সহমর্মিতার বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়।

 

নারীদের উপর অতিরিক্ত চাপ

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি সাধারণত নারীদের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। কারণ ধারণা করা হয়, নারীরা টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করে এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নারীর নামে ঋণ নেওয়া হলেও সেই টাকার নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় পুরুষের হাতে চলে যায়। ফলে নারী কেবল ঋণের দায়ভার বইতে থাকে, অথচ টাকার ব্যবহার বা সিদ্ধান্তে তার কোনো অধিকার থাকে না। অনেক নারী ঋণের কারণে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নামে নারীর কাঁধে বরং বাড়তি বোঝা চাপানো হয়েছে।

 

অপ্রোডাক্টিভ ঋণ প্রবাহ

ক্ষুদ্রঋণের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রচুর নগদ অর্থ প্রবাহিত হলেও তা প্রায়শই অপ্রোডাক্টিভ খাতে ব্যয়িত হয়। স্থানীয় বাজারে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা সাময়িকভাবে বাড়লেও এটি নতুন শিল্প, কৃষি উৎপাদন বা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতারা ব্যবসা শুরু করলেও মূলধন অপ্রতুলতার কারণে সেটি টিকিয়ে রাখতে পারে না। ফলে ঋণ টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে ভোগবাদ অস্থায়ী আর্থিক স্বস্তি তৈরির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

 

দারিদ্র্য ফাঁদে আটকে পড়া

ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেকের জন্য নতুন এক দারিদ্র্য ফাঁদে পরিণত হয়। এক ঋণ শোধ করতে আরেকটি ঋণ নেওয়া, সম্পদ বিক্রি করে কিস্তি শোধ করা, গবাদি পশু বা জমি হারানোএসব ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়শই ঘটে। দরিদ্র মানুষ ভেবে নেয় ঋণ ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের বোঝা বইতে গিয়ে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

পারিবারিক সামাজিক সংকট

ক্ষুদ্রঋণের কারণে অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। স্বামীস্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ে, কারণ ঋণ শোধের জন্য সংসারের প্রায় সব আয় কিস্তিতে চলে যায়। সন্তানদের পড়াশোনা বা খাবারের জন্য পর্যাপ্ত টাকা থাকে না। কখনও কখনও সামাজিক অপমানের কারণে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে গ্রামের জমি বিক্রি করতে হয় বা শহরে চলে যেতে হয়, যা গ্রামীণ সমাজে নতুন ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে।

 

জাতীয় অর্থনীতিতে সীমিত প্রভাব

দীর্ঘ কয়েক দশক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চললেও বাংলাদেশে এর প্রভাব খুব বেশি ইতিবাচক হয়নি। দারিদ্র্যের হার কমার পেছনে ক্ষুদ্রঋণের অবদান সীমিত। প্রকৃতপক্ষে শিল্পায়ন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে অনেক বেশি ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বব্যাংক অন্যান্য গবেষণা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ দীর্ঘমেয়াদে আয় বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং কখনও কখনও এটি বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে, কারণ যাদের সামান্য মূলধন সক্ষমতা ছিল তারাই ঋণ ব্যবহার করে কিছুটা উন্নতি করতে পেরেছে, কিন্তু একেবারে হতদরিদ্ররা আরও পিছিয়ে পড়েছে।

 

ঋণ ব্যবসায় পরিণত হওয়া

বাংলাদেশে অনেক এনজিও ক্ষুদ্রঋণকে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিবর্তে একটি ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা গরিব মানুষের কাছ থেকে উচ্চ সুদের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করছে। অনেক সংস্থার প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে ঋণ, আর কারণে তারা বারবার নতুন ঋণগ্রহীতা তৈরি করছে। এভাবে ক্ষুদ্রঋণ একটি লাভজনকঋণ ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে, যেখানে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষই মূল ভোক্তা। আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষুদ্রঋণকে গরিব মানুষের আর্থিক মুক্তির হাতিয়ার বলা হলেও বাস্তবে তা প্রমাণিত হয়েছে গরিব মানুষের উপর এক ধরনের শোষণের মাধ্যম হিসেবে।

 

দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা

ক্ষুদ্রঋণের আরেকটি বড় অসুবিধা হলো এটি দারিদ্র্যের মূল কাঠামোগত কারণগুলো সমাধান করে না। যেমনকর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষা দক্ষতার ঘাটতি, কৃষিতে আধুনিকায়নের অভাব, শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ সংকট, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর দুর্বলতা। ক্ষুদ্রঋণ কেবল সাময়িকভাবে কিছু নগদ অর্থের প্রবাহ ঘটায়, কিন্তু এই মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় দারিদ্র্য চক্র অটুট থেকে যায়।

 

শেষ করিঃ 

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ একসময় আশার আলো জ্বালালেও সময়ের সাথে সাথে এর নানা কুফল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উচ্চ সুদের বোঝা, ঋণজাল, মানসিক চাপ, সামাজিক বিভেদ, নারীর উপর বাড়তি চাপ, অপ্রোডাক্টিভ ঋণ প্রবাহ এবং দারিদ্র্য ফাঁদএসবের কারণে মাইক্রো ক্রেডিট প্রকৃত দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হতে পারেনি। বরং এটি গরিব মানুষের জীবনে নতুন ধরনের শোষণ, সংকট অস্থিরতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ক্ষুদ্রঋণ নয়, বরং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, মানসম্মত শিক্ষা, কৃষি সংস্কার এবং সুশাসনই হতে পারে কার্যকর সমাধান। ক্ষুদ্রঋণের কুফল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন সময় এসেছে বিকল্প উন্নয়ন কৌশল খুঁজে বের করার, যাতে মানুষ সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে পারে।

 

Comments

Popular posts from this blog

বিরাজনীতিকরণের ফাঁদে বিএনপি: তারেক রহমান, ড. ইউনুস ও বিকল্প রাজনীতির সংকট

ফরাসি বিপ্লব ব্যবচ্ছেদ

হাসিনা সরকারের পতনের পরে সেনাবাহিনী প্রধান জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এর আগে তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করে হাসিনা সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তার সামগ্রিক ভুমিকা সুনিপুনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করুন।